আদৌ কী শান্তি আসবে আফগানিস্তানে?

0
58
জালমেয় খলিল জাদ। ছবিঃ সংগ্রহীত

দীর্ঘ প্রায় দুদশক ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দোহায় অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যকার ছয়দিনের রুদ্ধশ্বাস আলোচনায় বেশ অগ্রগতি লক্ষ করা গিয়েছে। পাকিস্তানের ইংরেজী দৈনিক ডনের তথ্য মতে, ইতোমধ্যেই একটি খসড়া সমঝোতা চুক্তির কাছাকাছি পৌছেছে দুই দেশের প্রতিনিধিরা।
সমঝোতায় তালেবানের পক্ষ থেকে আফগানিস্তান থেকে সব ধরণের বিদেশী সেনা প্রত্যাহারের দাবী জানানো হয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের মাটি যেন আল-কায়েদা কিংবা আইএস যোদ্ধাদের নতুন ঘাটি না হয়ে উঠে সেই ব্যাপারে শক্ত প্রতিশ্রুতি চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

গেলো বছরের শেষ দিকে সিরিয়ার পাশাপাশি আফগানিস্তান থেকেও সেনা প্রত্যাহারের ঘোষনা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই ঘোষনায় বিশ্বজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়, আলোচনা-সমালোচনা।

কারো কারো মতে, সেনাপ্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্তের পর দুই পক্ষের মধ্যকার আলোচনা শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করেছে। কেউ কেউ আবার এটিকে তালেবানের নীতির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অসহায় আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখছেন। তবে স্বভাবতই প্রশ্ন এসেছে, প্রায় সতেরো বছরের এই যুদ্ধের অর্জন ঠিক কতোটুকু? সেনাপ্রত্যাহার কিংবা তালেবানের সাথে শান্তি আলোচনার মতোন বিষয়গুলো আফগানিস্তানকে একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কিনা সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। যেই পক্ষের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’  পরিচালনা করা হলো সতেরো বছর পর সেই একই পক্ষের সাথে একই টেবিলে বসে শান্তি আলোচনার ব্যাপারটিকে অনেকে দেখছেন ‘হাস্যকর’ হিসেবে।

‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ ব্যানারের আড়ালে দক্ষিন এশিয়ায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করা এবং আধিপত্য বিস্তারের তীব্র আকাঙ্ক্ষাই যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তানের প্রতি আকৃষ্ট করেছিলো বলে মনে করেন অনেকে। পরিস্থিতি নাগালের বাহিরে চলে যাওয়ায় এখন তল্পিতল্পা গুটিয়ে রওনা হয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয়।

তবে শান্তি আলোচনা চলমান থাকলেও আফগানিস্তানের বিভিন্ন শহরে তালেবানের হামলা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরে ইতোমধ্যে আফগানিস্তানের বিভিন্ন সামরিক আস্তানায় হামলা চালিয়ে নিরাপত্তাবাহিনীর প্রায় ৩০০ সদস্যকে হত্যা করেছে গোষ্ঠীটি। গত শুক্রবার আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি জানান,  গত পাঁচ বছরে তালেবানের হাতে হত্যার শিকার হয়েছে আফগান নিরাপত্তাবাহিনীর প্রায় ৪৫ হাজার সদস্য।

ছবি- Getty Image

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর নব্বইয়ের দশকে তালেবানের উত্থান ঘটে আফগানিস্তানে। এরপর ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর দেশটিকে শাসন করে গোষ্ঠীটি। জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয় শরিয়াহ আইন।  নারী শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে নারী অংশগ্রহনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে চালু করা হয় প্রকাশ্য মৃত্যুদন্ড প্রথা। চলতে থাকে হত্যা ও নির্যাতন। আফগানিস্তানের সিংহভাগ অঞ্চল চলে যায় তালেবানের নিয়ন্ত্রনে।

২০০১ সালে ৯/১১ ঘটনায় জড়িতদের মদদ দেয়ার অভিযোগ এনে তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তৎকালীন বুশ প্রশাসন। খুব কম সময়ের মধ্যে আফগানিস্তানের বেশিরভাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রন হারালেও একেবারে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়নি গোষ্ঠীটিকে। ফলাফল দীর্ঘ দুই দশকের সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী সংঘাত। আফগানিস্তানের মাটিতে মার্কিন সেনাবাহিনীর উপস্থিতি দেশটিকে আরো অনিরাপদ করে তুলেছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

এর আগেও অনেকবার শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা তৈরী হলেও আলোর মুখ দেখেনি একটিও। বারবার ই দেশটি থেকে বিদেশী সেনাপ্রত্যাহারের দাবী জানিয়ে আসছিলো গোষ্ঠীটি। বেশকয়েকবার আফগান সরকারের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসার কথা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও আফগান প্রেসিডেন্টের আচরণে সন্দেহ প্রকাশ করে সেই পথ থেকে সরে আসে তালেবান। ফলে অচলাবস্থার তৈরী হয় শান্তি প্রক্রিয়ায়।

অবশেষে নানান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর দুই পক্ষই একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌছতে সমর্থ হয়েছেন। যুদ্ধ বিরতির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাপ্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার উপর নির্ভর করবে বলে জানিয়েছেন তালেবান প্রতিনিধি। সবদিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এবং আফগান সরকারকে অনেকটা বেকায়দায় ফেলে দেয়া এই শান্তি আলোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানকে তাই তালেবানের জয় হিসেবেই দেখছেন কেউ কেউ।

তবে এই শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ কী? আদৌ কী শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে আফগানিস্তানে? যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান তালেবানদের ক্ষমতা গ্রহনের উদ্দেশ্যকে আরো সুসংহত করবে এমনটা অনুমিতই। তাদের ক্ষমতায়নে আফগানিস্তান যে আবার সেই নব্বইয়ের দশকে ফিরে যাবে সেই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে কেন এই সতেরো বছরের সংঘাত? আফগানিস্তানের সমাজ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে অর্থনীতি, রাজনীতি সবকিছুকে ধসিয়ে দেয়া এই যুদ্ধের শেষ কী শুধু সমঝোতাতেই সম্ভব? ক্ষমতা যদি মৌলবাদী তালেবানদের হস্তগত হয় তবে দেশ যে আরেকটি গৃহযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করবেনা তার নিশ্চয়তা কে দিবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here