কলিন ও’ব্র্যাডিঃ ওয়ান স্টেপ এট এ টাইম।

0
71
উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ডেনালি জয়ের পর কলিন

আপনাকে যদি কখনো প্রশ্ন করা হয় যে, ‘একজন মানুষের মানসিক দৃঢ়তা ঠিক কতোটুকু উচ্চতায় যেতে পারে?’ তবে আপনার উত্তর কী হবে?

কলিন ও ব্র‍্যাডিকে ওই একই প্রশ্ন করা হলে তিনি হয়তো বলতেন, ‘সেটি ওই মানুষের সিদ্ধান্ত যে সে তার দৃঢ়তাকে ঠিক কতোটা উচ্চতাতে নিয়ে যেতে পারে।’

কলিন ও ব্র‍্যাডি।  মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ‘Explorers Grand Slam’ জয়ী এই এথলেটের কাজ ই ছুড়ে দিয়েছে উপরোক্ত প্রশ্ন যার জবাবও লুকিয়ে আছে তার কাজেই।

Explorer’s Grand Slam কী?

ছবিঃ ইন্টারনেট

এটি এমন একটি এডভেঞ্চার চ্যালেঞ্জ যা মূলত পৃথিবীর দুই মেরু এবং সাত মহাদেশের সাত সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয়ের সমন্বয়ে তৈরী। অর্থাৎ, কোন ব্যাক্তি যদি ‘Explorer’s Grand Slam’ জয় করতে চান তবে তাকে পৃথিবীর দুই মেরু(উত্তর এবং দক্ষিন) এবং সাত মহাদেশের সাতটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করতে হবে। ১৯৯৮ সালের পর থেকে এই পর্যন্ত গত বিশ বছরে ৬৩ জন সক্ষম হয়েছেন এই চ্যালেঞ্জটি সম্পন্ন করতে।

কে এই কলিন ও’ব্র‍্যাড?

এখন পর্যন্ত Explorer’s Grand Slam জয় করা সেই ৬৩ জনের একজন কলিন ও’ব্র‍্যাড। যার দখলে রয়েছে সবচেয়ে কম সময়ে এই চ্যালেঞ্জ সম্পন্ন করার রেকর্ডটিও। প্রশ্ন আসতে পারে এ ছাড়াও তো আরো ৬৩ জন এই চ্যালেঞ্জ সম্পন্ন করেছে। তবে শুধুমাত্র কলিন ও’ব্র‍্যাড ই কেন?

কলিন ও’ব্র্যাডি

গল্পের শুরুটা একদম ছোট বেলায়। ১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে জন্ম নেওয়া কলিনের শৈশব কেটেছে অরিগন অঙ্গরাজ্যের পোর্টল্যান্ডে। সেখানে থাকাকালীন শৈশবের বেশিরভাগ সময় কেটেছে উত্তর-পশ্চিম মহাসাগরীয় অঞ্চলের পর্বতমালায় ঘুরে যা পরবর্তীতে তাকে একজন দুঃসাহসিক অভিযাত্রী হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। পাহাড় চড়ার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও বেশ সক্রিয় ছিলেন তিনি।

ছবিঃ কলিন ও’ ব্র্যাডির ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহীত

সাতারু এবং ফুটবলার হিসেবে পেয়েছিলেন জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃতি। এসবকিছুর পরেও একটি স্বপ্ন ছিলো যেটি তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়াতো। সেটি ছিলো ‘বিশ্বজয়ের স্বপ্ন’। সেই স্বপ্নজয়ের জন্য দরকার ছিলো প্রচুর টাকার। আর্থিক সংস্থানের জন্য শুরু করলেন হাউজ পেইন্টিংয়ের কাজ। সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থ জমিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকলেন বিশ্বকে ঘুরে দেখার চ্যালেঞ্জের জন্য।

অবশেষে এলো সেই কাঙ্খিত সময়। ২০০৬ সালে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেই নিজের স্বপ্নপুরণের লক্ষ্যে একটি ব্যাগপ্যাক আর সার্ফবোর্ড কাধে ঝুলিয়েই বেরিয়ে পড়লেন বিশ্বজয়ের উদ্দেশ্যে।

তবে স্বপ্নপুরণের পথে অর্ধেক না পেরুতেই তার জীবনে এলো সবচাইতে বড় বাধা।  ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে থাইল্যান্ডের একটি দ্বীপে ঘটে যাওয়া এক আকস্মিক দূর্ঘটনা তাকে ঠেলে দিয়েছিলো অনিশ্চয়তার দ্বারপ্রান্তে। যেই দূর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো  পা-সহ তার শরীরের ২৫ শতাংশ।

ছবিঃ কলিন ও’ব্র্যাডির ওয়েবসাইট হতে সংগ্রহীত

এতোসব অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনে প্রথমবারের মতোন নিজের উপর ভরসা হারাতে বসা কলিনের জীবনে আলো হয়ে এলেন তার মা। ফোর্বস  সাময়িকীকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে কলিন তার মায়ের অবদান স্বীকার করে বলেন, ‘এই গল্পটা ছিলো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার গল্প। ডাক্তার বলেছিলেন আমি আর কখনো স্বাভাবিক ভাবে হাটতে পারবোনা। আমি যখন থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালে হেরে যাওয়ার যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছিলাম তখন আমার মা আমার পাশে এসে বসে বলেছিলেন যে আমার জীবন এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এবং এই জীবনে আমি আরো অনেক চমকপ্রদ কিছু করার ক্ষমতা রাখি। তার এই কথাগুলোই আমাকে সেই ঘটনার আঠারো মাস পরে ‘শিকাগো ট্রায়াথলন’ এর রেসট্র‍্যাকে দাড় করিয়েছিলো।  সেদিন ৫০০০ অংশগ্রহনকারীদের মধ্য থেকে আমি ঘরে ফিরেছিলাম প্রথম হয়ে। তবে সেটি একদিনে হয়নি। দীর্ঘ তিনমাস হুইলচেয়ারে বসে থাকার পরে একদিন হঠাৎ আমার মা আমার হুইলচেয়ার থেকে ঠিক এক ধাপ সামনে একটি চেয়ার রেখে বললেন এটি আমার লক্ষ্য। সেদিন প্রায় তিন ঘন্টার চেষ্টায় আমি আমার একমাত্র পদক্ষেপটি নিয়েছিলাম। আমি শিখেছিলাম কোন কাজ একদিনে হয়না। জীবনে এগিয়ে যেতে প্রতিটি পদক্ষেপ ই জরুরি।’

ছবিঃ ইন্টারনেট

শিকাগো ট্রায়াথলনে প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি নজর কাড়েন সেখানে উপস্থিত স্পন্সরদের। পরবর্তীতে একজন প্রফেশনাল ট্রায়াথলেট হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেছেন ছয়টি মহাদেশের পঁচিশটি দেশে।

Beyond 7/2

ছয় বছর প্রফেশনাল ট্রায়াথলেট হিসেবে কাজ করার পর বিশ্বকে জয় করার নতুন চ্যালেঞ্জ হাতে নিলেন কলিন এবং তার স্ত্রী জেনা। চ্যালেঞ্জটি ছিলো ‘ The Explorers Grand Slam’! অভিযান শুরুর পূর্বে শিশুদের স্বপ্ন পূরণে উদ্দীপনা যোগাতে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘Beyond 7/2’ প্রতিষ্ঠা করেন কলিন-জেনা দম্পতি৷ যা আজ হাজারো শিশুর স্বপ্ন পূরণে কাজ করে চলেছে।

পরিকল্পনা গ্রহনের পর জেনা এবং কলিন পরবর্তীতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ফান্ডারাইজিং এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অনুসন্ধানে। আঠারো মাসের প্রস্তুতি শেষে অবশেষে শুরু হয় অভিযান।

এক্সপ্লোরারস গ্র্যান্ডস্লাম জয়ের অভিযানে কলিন

২০১৬ সালের চার জানুয়ারি ৮৯° ডিগ্রি দক্ষিন অক্ষরেখা থেকে যাত্রা শুরু করে ৭দিনে ৬৯ মাইল পারি দিয়ে পৌছান ৯০° ডিগ্রি দক্ষিন অক্ষরেখায়।

ছবিঃ ইন্টারনেট

এরপর জানুয়ারির শেষদিকে মাউন্ট ভিনসন(এন্টার্কটিকা, ১৬,০৫০ ফুট) এবং মার্চের  শেষ সপ্তাহের মধ্যে আকনকাগুয়া( দক্ষিন আমেরিকা, ২২,৮৩৮ ফুট), কারস্তনেজ পিরামিড( ওশেনিয়া, ১৬,০২৪ ফুট),  কিলিমাঞ্জারো ( আফ্রিকা, ১৯,৩৪১ ফুট), মাউন্ট এলব্রুস ( ইউরোপ, ১৮,৫১০ ফুট) জয় করেন কলিন।

ছবিঃ ইন্টারনেট

এপ্রিলে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দু মাউন্ট এভারেস্ট (এশিয়া, ২৯,০২৯ ফুট) জয় করার আগে হার মানান প্রতিকুলতায় ঠাসা উত্তর মেরুকেও। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২৭ মে উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ  ডেনালি (২০,৩১০ ফুট) জয়ের মধ্য দিয়ে মাত্র ১৩৯ দিনে ‘Explorers Grand Slam’ সম্পন্ন করে রেকর্ড বইয়ে সবার উপরে স্থান করে নিয়েছেন কলিন ও’ব্র‍্যাডি!

 

দক্ষিন মেরু জয়ের পথে কলিন

‘Explorers Grand Slam’ জয় করেই থেমে থাকেন নি কলিন ও’ব্র‍্যাডি। গেলো বছর সম্পূর্ন একাই এন্টার্কটিকা মহাদেশ ভ্রমণ করেছেন তেত্রিশ বছর বয়সী দুঃসাহসী এই মার্কিন অভিযাত্রী। এর আগে বিভিন্ন জন বিভিন্ন সময়ে এই মহাদেশ ভ্রমণ সম্পন্ন করলেও সম্পুর্ন একা এবং কোন ধরণের সহায়তা ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ সম্পন্ন করা ব্যাক্তি তিনিই প্রথম।

নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি তুলে এনেছিলেন প্রতিকুলতায় ঠাসা এমন একটি মহাদেশে ৫৪ দিন সম্পূর্ন একাকী থাকার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

ছবিঃ ইন্টারনেট

মায়ের উদ্দীপনায় সেদিনের তিন ঘন্টার চেষ্টায় নেয়া সেই পদক্ষেপ তাকে পৌছে দিয়েছে বিশ্বের সবচাইতে দুঃসাহসিক অভিযাত্রীদের তালিকায়। হয়তো সেইজন্যেই কলিন ও’ব্র‍্যাডি ভেঙে পড়তে জানেননা। হয়তো আজও কখনো কোন দূর্গম পথ পাড়ি দিতে গিয়ে একটু পিছিয়ে পড়লেও তার মন আপনাআপনি বলে উঠে ‘One Step at a time’!

 

তথ্যসুত্র ও কৃতজ্ঞতাঃ The New York Times, The Guardian, Colin O’Brady, Forbes, নয়াদিগন্ত, The Washington Post.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here