প্রশ্নবিদ্ধ জাদুর শহরের বসবাসযোগ্যতা!

    অপরিকল্পিত ঢাকা ছবিঃ সংগ্রহীত

    লন্ডন ভিত্তিক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ইকোনোমিস্টের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ প্রতিবছর ই রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা, অপরাধের মাত্রা, শিক্ষার সুযোগ, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যসেবার মানের মতোন বেশ কিছু সূচক বিবেচনায় নিয়ে বিশ্বের বসবাসের যোগ্য ও অযোগ্য শহরের একটি তালিকা প্রকাশ করে।

    প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় জাদুর শহর ঢাকার অবস্থান তৃতীয়। এই ক্ষেত্রে প্রথমে আছে যুদ্ধ বিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্ক এবং দ্বিতীয়তে আছে নাইজেরিয়ার লাগোস। আর গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে এক ধাপ এগিয়ে বর্তমানে এই নগরীর অবস্থান ১৩৮! বিশ্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত তো কেবল সিরিয়ার দামেস্ক নয়। বাকিসব যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরকে পেছনে ফেলে ঢাকার এই অবস্থান মোটেও রহস্যজনক নয়। ঢাকাকে কতিপয় লোকজনের ক্ষনে ক্ষনে লস এঞ্জেলেস কিংবা প্যারিস মনে হতে পারে। কিন্তু এখানে ব্যাতিক্রম হলো ঢাকার ভুগর্ভে বিস্ফোরণের অপেক্ষায় আছে লক্ষাধিক মাইন। অর্থাৎ আমাদের বসবাস একটি অবিস্ফোরিত মাইনফিল্ডের উপর। এই মাইনগুলো তো কোনো বহির্শক্তি এসে এখানে ফিট করে দিয়ে যাননি। তবে এদের রহস্য কী?

    অপরিকল্পিত নগরায়ন। বেশ কিছুদিন আগে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় ভুগর্ভে থাকা গ্যাসলাইন ফেটে গ্যাসে গ্যাসাকার হয়ে যায় পুরো এলাকা। বন্ধ করে দেয়া হয় গ্যাস সংযোগ। ‘চকবাজার ট্র‍্যাজেডির’ দিন সন্ধ্যায় মিরপুরেও একইভাবে ভুগর্ভে থাকা গ্যাসলাইন ফেটে আগুন ধরে যায় রাস্তায় থাকা বাস আর পিকাপ-ভ্যানে। এমন অহরহ ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে পুরো ঢাকাজুড়ে।

    নগর-পরিকল্পনাবিদদের মুখে ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণের পরিকল্পনার কথা শোনা গত এক দশক ধরে। বাস্তবতা প্রকাশ পায় ২০১৮ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে যেখানে বলা হয়, এই শহরে প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে ১৭০০ মানুষ। জীবন-যাত্রার মান একটু উন্নত হবে এই আশা নিয়ে এই মানুষগুলো যে কেবল একরাশ অনিশ্চয়তার দিকে এগুচ্ছেন সে ব্যাপারে কারোর ই খেয়াল থাকার কথা না। পরিকল্পিত নগরায়নে রাজউকের আইডিয়া ‘Detailed Area Plan(DAP)’ নানা বিতর্কে মুখ থুবড়ে পড়েছে বেশ কয়েক বছর আগেই। বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের ‘সবুজ ঢাকা’ পরিকল্পনাও। এটা অনুমিতই যে বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া ঢাকার এই দুর্দশা যেমন কাটবেনা তেমনি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সমান সুযোগসুবিধা ছড়িয়ে দেয়ার যে স্বপ্ন তার বাস্তবায়ন কার্যত অসম্ভব।

    জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ঢাকাকে ঘিরে থাকা চার নদীকে দখলদার মুক্ত করে তাদের জায়গা ফিরিয়ে দিয়ে প্রান ফিরিয়ে আনার দাবীও সেই প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই। দখলের পাশাপাশি নদীগুলোর দূষণের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে ন্যুনতম সীমা। অবশেষে এসব নদীর জায়গা তাদের ফিরিয়ে দিতে নতুন কেবিনেটের অধীনে বেশ কয়েক মাস যাবত তৎপর হয়েছে BIWTA( বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ)। যার কার্যকারিতা ঠিক কতোদিন এ নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।

    ঢাকার অলিগলিতে গড়ে উঠা অননুমোদিত বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরী করছে বিদ্যুৎ সংকট। নগরীতে বর্তমানে মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সহ বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান যেসবের বলি হতে হয়েছে হাজার হাজার গাছপালা। ফলাফলঃ উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং নগরীর বিষাক্ত বায়ু। বেশ কয়েকবার ‘সবুজ ঢাকা’ কিংবা ‘ছাদ বাগান’ এর মতো প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও সিটি কর্পোরেশন এবং নগরীর নাগরিকদের সদিচ্ছার অভাবে ইতোমধ্যে অন্ধকারে চলে যেতে বসেছে পরিকল্পনাগুলো।

    বিশেষজ্ঞদের মতে প্রতিটি মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য দরকার মাথাপিছু ২ হেক্টর বনভূমি যেখানে ঢাকায় এর পরিমান শূন্যের কাছাকাছি (০.০১৭ হেক্টর)।

    নয় বছর আগে পুরান ঢাকার নিমতলীতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পরপরই ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো সেখান থেকে সকল রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নেয়ার। সেসময় পুরান ঢাকায় কেমিক্যালের গুদামের সংখ্যা ছিলো ৮০০র কিছু বেশি। দশবছর পরে সেই পুরান ঢাকারই চকবাজারেই হলো নিমতলী ট্রাজেডির পুনরাবৃত্তি।

    নিমতলী, চকবাজার কিংবা বনানী। অপরিকল্পিত নগরায়নের অভিশাপ থেকে যে আমরা কেউই মুক্ত নই সে ব্যাপারে এখন আর কোন সন্দেহ নেই।

    জলবায়ু ও তাপমাত্রা, দূর্নীতি, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, খেলাধুলার স্থানের সুযোগ, খাদ্য ও পানীয়, ভোগ্যপণ্য সেবা, গৃহায়ন ও জ্বালানী, সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা এক কথায় একটা মহানগরীতে যেসব ন্যুনতম এবং মৌলিক সুযোগ সুবিধা আমরা আশা করি তার সবগুলো ক্ষেত্রেই যোজন যোজন পিছিয়ে ঢাকা

    অপরিকল্পিত এই জাদুর শহরে দুর্যোগ একটি সিরিয়াল কিলার। যা প্রতিটি বিপর্যয়ের পর রেখে যায় আসন্ন আরেকটি দুর্যোগের সংকেত। এসব থেকে শিক্ষা না নিয়ে আমরা যতোদিন কেবল একে অপরকে দোষারোপ,তদন্ত কমিটি গঠন আর পরিকল্পনা করতে থাকবো, ততদিনে এই জাদুর শহরের মৃত্যু হবে। আর সেই মৃত্যু হবে সবচেয়ে অসুন্দর আর করুণ। কঠোর আইন, প্রতিটি পরিকল্পনার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন, নগর এবং নাগরিকের মিলিত সচেতনতা যদি সম্ভব হয় তবেই হয়তো চারশ বছরের পুরোনো এই শহরে আবার প্রান সঞ্চার হবে।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here